কুষ্টিয়া জেলা বাংলাদেশের পশ্চিমান্ঞ্চলের একটি জেলা। জেলাটি খুলনা বিভাগের অন্তর্ভূক্ত। ১৯৪৭ সালের পূর্বে কুষ্টিয়া ছিলো ভারতের নদীয়া জেলার অন্তর্গত। দেশভাগের সময় থেকেই একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে কুষ্টিয়ার আত্মপ্রকাশ। সে সময় কুষ্টিয়া জেলা কুষ্টিয়া সদর, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর উপ-অন্ঞ্চলে বিভক্ত ছিলো। ১৯৮৪ সালে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরকে আলাদা জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৪৭ সালের কুষ্টিয়াকে বর্তমানে বৃহত্তর কুষ্টিয়া নামে অভিহিত করা হয়।
বহু বিখ্যাত মানুষের-বিশেষত কবি সাহিত্যিকদের জন্মভূমি এবং আবাস এই কুষ্টিয়া জেলা। যেমন: বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০) , বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), বাংলাভাষার প্রথম মুসলিম কথাসাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২), কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৮৯৯), জগদীশ গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭), বাঘা যতীন (১৮৭৯-১৯১৫), অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (১৮৬১-১৯৩০), জলধর সেন (১৮৬০-১৯৩৯), কবি দাদ আলী (১৮৫২-১৯৩৬), আকবর হোসেন (১৯১৭-১৯৮১), কবি আজিজুর রহমান (১৯১৪-১৯৭৮) প্রমুখ।
স্থানীয় লোকজনের অনেকেই কুষ্টিয়াকে কুষ্টি নামে ডেকে থাকেন। এ থেকে ধারনা করা হয় কুষ্টিয়া নামের উৎপত্তি কুষ্টা (পাট এর স্থানীয় নাম) থেকে,যা ছিলো একদা এ অন্ঞ্চলে ব্যাপকভাবে উৎপাদিত কৃষি পণ্য।
কুষ্টিয়া কোন প্রচীন জেলা নয়। মোঘল সম্রাট শাহজাহানের আমলে এখানে একটি নদীবন্দর গড়ে তোলা হয়। তখন থেকেই এই অন্ঞ্চলের উন্নয়নের সূচনা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এই নদী বন্দরের ব্যাপক ব্যবহার শুরু করে; কিন্তু শহর হিসেবে এর বেড়ে ওঠা নীল চাষী ও নীল ব্যবসায়ীদের আগমনের পর।
তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কোলকাতার সাথে ১৮৬০ সালে কুষ্টিয়ার রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবার পর এখানে দ্রুত শিল্পায়ন হতে থাকে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- যজ্ঞেশ্বর ইন্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস (১৮৯৬), রেইনউইক এন্ড যজ্ঞেশ্বর কোম্পানী (১৯০৪), মোহিনী মিলস (১৯১৯)।
১৮৬০ সালে পুরো বাংলাতে নীল বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। কুষ্টিয়ার প্যারী সুন্দরী এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা,যাঁর নেতৃত্বে কুষ্টিয়ার নীল চাষীরা সরকারকে কর দেয়া বন্ধ করে দেন।
মোঘল আমলের শাহী মসজিদ এ অন্ঞ্চলের ধর্মীয় সংস্কৃতির উৎকর্ষতার নিদর্শন বহন করে।
১৮৬৯ সালে কুষ্টিয়া পৌরসভা গঠিত হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার তাত্পর্যপূর্ণ অবদান লক্ষণীয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তান আর্মির ২৭তম বেলুচ রেজিমেন্টের ১৪৭জনের একটি কোম্পানী যশোরের বেজ ক্যান্টনমেন্ট থেকে কুষ্টিয়া পৌছায়। প্রথমেই তারা স্থানীয় পুলিশ স্টেশন দখল করে নেয়। কিন্তু দ্রুতই তারা স্থানীয় জনগণ,ছাত্র,পুলিশ ও আনসারদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অংশের প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। ১লা এপ্রিল নাগাদ পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয় এবং কুষ্টিয়া সম্পূর্ণভাবে মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।
পরবর্তীতে ’৭১ এর ১৭ই এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা বৈদ্যনাথতলাতে (বর্তমান মেহেরপুরের মুজিবনগর) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের নেতৃত্বেই নয় মাসব্যাপী বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। ১১ই ডিসেম্বর,১৯৭১ কুষ্টিয়া চূড়ান্তভাবে দখলদারমুক্ত হয়।